আজ গনেশ চতুর্থী , জানুন গনেশের জন্মকথা।

শাস্ত্রে রয়েছে যে কোনও পুজোর আগেই গণেশ পুজো করতেই হবে ৷ মঙ্গলজনক কাজের শুরু হয় গণেশেরই হাত দিয়ে৷ কাল গণেশ চতুর্থী ৷ গোটা দেশে আড়ম্বর সহকারে পূজিত হবেন গণেশ ৷ কোথাও প্রায় ১০ দিন, কোথাও ৫ দিন চলবে গণেশ পূজোর উৎসব ৷ সংসারে শ্রীবৃদ্ধি আনতে, সুখ আনতে, সিদ্ধি লাভের জন্য গণেশ পুজো অত্যন্ত জরুরী ৷
সনাতন ধর্মালম্বীদের আরাধ্য গণেশের জন্ম থেকে শুরু করে তাঁর প্রথম পুজো হওয়া পর্যন্ত এমন বহু ঘটনা রয়েছে, যা আমাদের অনেকের অজানা। অনেকে ডাকেন গণপতি নামে, অনেকে ডাকেন গণেশ, অনেকে ডাকেন বিনায়ক নামেই ৷
আগে জেনে নেওয়া যাক গণপতি গণেশের জন্মের কাহিনি। কথিত আছে, উবটন দিয়ে একটি বালকের মূর্তি তৈরি করেন মাতা পার্বতী। এর পর তাতে প্রাণ প্রতিষ্ঠা করেন। জীবনদানের পর ওই বালককে নিজের পুত্র স্বীকার করেন মাতা পার্বতী। শুধু তাই নয় পরম শক্তিশালী এবং বুদ্ধিমান হওয়ারও আশীর্বাদ দেন তাকে। যে সময় গণেশের জন্ম হয়, তখন দেবাদি দেব মহাদেব কৈলাশে ছিলেন না।
কৈলাশ ফেরার পর গুফাদ্বারে একটি বালককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন। সেই গুফাতেই ছিলেন পার্বতী। মা-এর আদেশ মেনে শিবকে ওই গুফায় প্রবেশ করতে দেননি গণেশ। ফলে গণেশের ওপর রেগে যান মহাদেব। এর পরই দেবতাদের সঙ্গে গণেশের যুদ্ধ বাধে। একে একে সমস্ত দেবতাই গণেশের শক্তির সামনে পরাজিত হন। এর পর ত্রিশূল দিয়ে নিজের অজান্তেই পুত্র গণেশের শিরোশ্ছেদ করেন মহাদেব।
পুত্র গণেশের মৃত্যুতে ক্রুদ্ধ পার্বতীকে শান্ত করতে অবশেষে পুত্র গণেশের প্রাণ ফিরিয়ে দেন মহাদেব। হাতির মাথা ওই বালকের দেহে যুক্ত করা হয়।
জন্মের কিছু সময় পর পিতার সঙ্গে যুদ্ধ এবং তার পর প্রথম পূজ্যের আসন লাভ করেন তিনি। কিন্তু এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল তার জন্ম সময়ের কারণ।
শাস্ত্র মতে, ভাদ্রপদ শুক্লপক্ষের চতুর্থী তিথিতে গণেশের জন্ম হয়। তাই শাস্ত্রে ভাদ্রপদ শুক্লপক্ষের চতুর্থী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দিনই সারা দেশে গণেশ চতুর্থী পালিত হয়।
জ্যোতিষশাস্ত্রে চতুর্থীকে রিক্তা তিথি বলা হয়েছে, সে দিন কোনও শুভ কাজ হয় না। কিন্তু সে দিনই গণেশের জন্মদিন হওয়ায় চতুর্থীতে রিক্তা তিথির দোষ গ্রাহ্য করা হয় না। তাই সমস্ত শুভ কাজ করা যায়। গণেশের কুষ্ঠিতে লগ্নে বৃশ্চিক রাশি রয়েছে এবং মঙ্গল বিরাজ করছে।
লগ্নস্থানে শনির পূর্ণদৃষ্টি রয়েছে। আবার সূর্যের ওপর শনির দৃষ্টি থাকার ফলেই বাবার হাতে পুত্রের শিরোশ্ছেদ হয়।
গণেশের কুষ্ঠিতে লগ্ন এবং লগ্নেশে বৃহস্পতির পূর্ণ দৃষ্টি রয়েছে। বৃহস্পতি দ্বিতীয় এবং পঞ্চম গৃহের স্বামী। অন্য দিকে বুধও স্বরাশির। এ কারণে গণেশ বুদ্ধি এবং জ্ঞানের দাতা এবং প্রথম পূজ্য।
গণেশের কুষ্ঠিতে পঞ্চমহাপুরুষ যোগের মধ্যে শশ এবং রুচক নামের যোগ তৈরি হয়। দসমেশ নিজের গৃহে রয়েছেন, তাই গণেশ শিবের গণের অধ্যক্ষ। তিনি গণাধ্যক্ষ নামেও পরিচিত।
গণেশের অপর নাম বিঘ্নহর্তা। কারণ তিনি সমস্ত ধরনের বিঘ্ন-বাধা দূর করেন। লগ্নে অবস্থিত মঙ্গলে শনি এবং বৃহস্পতির দৃষ্টির কারণে তিনি এই ক্ষমতা পান।
“বক্রতুণ্ড মহাকায় সূর্যকটি সমপ্রভা, নির্বিঘ্নম কুরু মে দেব সর্ব কার্যেসু সর্বদা”

জেনে নিন কোন মন্ত্রে সন্তুষ্ট হন সিদ্ধিদাতা গণেশ।

গণেশ চতুর্থী মানেই তো সিদ্ধিলাভের আশা। ফলে ভক্তরা ভাদ্র মাসের গনপতি বাপ্পার আরাধনায় মেতে ওঠেন। পুরুত ডেকে পুজোর আয়োজন সেরে ফেলুন৷ যদি তা নাও ডাকেন নিজেই নিজের বাড়িতে করে নিতে পারেন গনেশ পুজো৷ এবার জেনে নিন এই পুজোর কেমন করে করবেন৷

এই পুজোর প্রস্তুতি জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে -ধূপ, আরতির থালা, সুপুরি, পান পাতা, গনেশের জন্য নতুন পোশাক, চন্দন কাঠ।
এবার ওম গণ গনপতায় নমঃ মন্ত্র উচ্চারণের মাধ্যমে শুরু হয় গনেশ আরাধনা। আরতির থালায় সুগন্ধি ধূপ জ্বালিয়ে সূচনা করুন গনেশ পুজোর। এরপর চন্দন কাঠের সামনে সাজিয়ে রাখুন পান পাতার ওপর সুপুরি। যারা গনেশ চতুর্থীর আগেই বাড়িতে মূর্তি নিয়ে আসছেন তারা নির্দিষ্ট দিনের আগের পর্যন্ত নতুন কাপড়ে বিগ্রহের মুখ ঢেকে রাখবেন। পুজোর দিন মূর্তি স্থাপনের আগে মুখ খুলবেন না। গনেশ নিয়ে ঘরে প্রবেশের আগে চাল ছড়াতে ভুলবেন না। মূর্তি স্থাপনের আগেও ছড়িয়ে দিন চাল। ওপরে রাখুন সুপুরি, কাঁচা হলুদ, লাল কুমকুম ও দক্ষিণা।
পুজোর মূল পর্বের প্রয়োজনীয় সামগ্রী হল মূর্তি স্থাপনের পর প্রয়োজন লাল ফুল, দূর্বা ঘাস, মোদক, নারকেল, লাল চন্দন, ধুনো ও ধূপ।
এবার দেখে নেওয়া যাক মূল পুজো পদ্ধতি- বাড়িতে গনেশ মূর্তি স্থাপনের আগে সারা বাড়ি পরিষ্কার করুন। স্নান সেরে মন্ত্রের মাধ্যমে মূর্তিতে প্রাণ প্রতিষ্ঠার পর শুরু হবে পুজো। ঋক বেদ বা গণেশ সুক্তায় পাবেন প্রাণ প্রতিষ্ঠার মন্ত্র। প্রাণ প্রতিষ্ঠার পরই ধূপ ও প্রদীপ জ্বালিয়ে শুরু করুন আরতি। এরপর ষোড়শপচারে গনেশ আরাধনা করুন। গনেশ বন্দনার ১৬টি রীতির নামই ষোড়শপচার। এরপর ২১টি দূর্বা ঘাস, ২১টি মোদক ও লাল ফুল গনেশের সামনে সাজিয়ে রাখুন। মূর্তির মাথায় আঁকুন লাল চন্দনের টিকা। এরপর গনেশ মূর্তির সামনে নারকেল ভেঙে অশুভ শক্তিকে দূর করুন। তারপর গনেশের ১০৮ নাম জপ করুন। মূর্তির সামনে করজোড়ে প্রার্থনা করুন পরিবারের সুখ, সমৃদ্ধি।
ওঁ গাং গণেশায় নমঃ
একদন্তং মহাকায়ং
লম্বোদর গজাননম।
বিঘ্নবিনাশকং দেবং
হেরম্বং পনমাম্যহম..

শুভ গনেশ চতুর্থীর পুণ্য লগ্নে সকলকে ‘শুভ গনেশ চতুর্থী’-র আন্তরিক শুভেচ্ছা আর অভিবাদন, পার্বতীনন্দন আমাদের সর্বদা সুখে রাখুন আর আমাদের মনের সকল ইচ্ছা পুরন করুন, হে সিদ্ধিবিনায়ক, তোমার চরনে আমাদের শতকোটি প্রনাম, আমাদের সুবুদ্ধি দাও হে গজানন, “ওঁ শ্রী শ্রী সিদ্ধিদাতা গনেশায় নমঃ”
একদন্তং মহাকায়ং লম্বোদর গজাননম। বিঘ্নবিনাশকং দেবং হেরম্বং পনমাম্যহম।।
অর্থাত্‍, “যিনি একদন্ত, মহাকায়, লম্বোদর, গজানন এবং বিঘ্ননাশকারী সেই হেরম্বদেবকে আমি প্রণাম করি।
আজওঁ সর্ব্ববিঘ্ন বিনাশয় সর্ব্বকল্যান হেতবে । পার্ব্বতী প্রিয় পুত্রায় গনেশায় নমো নমঃ ।

শুভ গনেশ চতুর্থী
*রামকৃষ্ণ চ্যাটার্জী*।*এস প্লাস নিউজ*

শেয়ার করুন