“বাজলো তোমার আলোর বেণু “- মা আসছেন

রামকৃষ্ণ চ্যাটার্জী , এস প্লাস নিউজ : আশ্বিনের শারদপ্রাতে বেজে উঠেছে আলোক মঞ্জীর;
ধরণীর বহিরাকাশে অন্তরিত মেঘমালা;
প্রকৃতির অন্তরাকাশে জাগরিত জ্যোতির্ময়ী জগন্মাতার আগমন বার্তা।
আনন্দময়ী মহামায়ার পদধ্বনি অসীম ছন্দে বেজে উঠে রূপলোক ও রসলোকে আনে নব ভাবমাধুরীর সঞ্জীবন।
তাই আনন্দিতা শ্যামলীমাতৃকার চিন্ময়ীকে মৃন্ময়ীতে আবাহন।
আজ চিৎ-শক্তিরূপিনী বিশ্বজননীর শারদ-স্মৃতিমণ্ডিতা প্রতিমা মন্দিরে মন্দিরে ধ্যানবোধিতা।

মহামায়া সনাতনী, শক্তিরূপা, গুণময়ী।
তিনি এক, তবু প্রকাশ বিভিন্ন—
দেবী নারায়ণী,
আবার ব্রহ্মশক্তিরূপা ব্রহ্মাণী,
কখনো মহেশ্বেরী রূপে প্রকাশমানা,
কখনো বা নির্মলা কৌমারী রূপধারিণী,
কখনো মহাবজ্ররূপিণী ঐন্দ্রী,
উগ্রা শিবদূতী,
নৃমুণ্ডমালিনী চামুণ্ডা,
তিনিই আবার তমোময়ী নিয়তি।
এই সর্বপ্রকাশমানা মহাশক্তি পরমা প্রকৃতির আবির্ভাব হবে, সপ্তলোক তাই আনন্দমগ্ন।

হে ভগবতী মহামায়া, তুমি ত্রিগুণাত্মিকা;
তুমি রজোগুণে ব্রহ্মার গৃহিণী বাগ্‌দেবী,
সত্ত্বগুণে বিষ্ণুর পত্নী লক্ষ্মী,
তমোগুণে শিবের বণিতা পার্বতী,
আবার ত্রিগুণাতীত তুরীয়াবস্থায় তুমি অনির্বচনীয়া, অপারমহিমময়ী, পরব্রহ্মমহিষী;
দেবী ঋষি কাত্যায়নের কন্যা কাত্যায়নী,
তিনি কন্যাকুমারী আখ্যাতা দুর্গি,
তিনিই আদিশক্তি আগমপ্রসিদ্ধমূর্তিধারী দুর্গা,
তিনি দাক্ষায়ণী সতী;
দেবী দুর্গা নিজ দেহ সম্ভূত তেজোপ্রভাবে শত্রুদহনকালে অগ্নিবর্ণা, অগ্নিলোচনা।
এই ঊষালগ্নে, হে মহাদেবী, তোমার উদ্বোধনে বাণীর ভক্তিরসপূর্ণ বরণ কমল আলোক শতদল মেলে বিকশিত হোক দিকে-দিগন্তে;
হে অমৃতজ্যোতি, হে মা দুর্গা, তোমার আবির্ভাবে ধরণী হোক প্রাণময়ী।
জাগো! জাগো, জাগো মা!

জাগো, জাগো দুর্গা, জাগো দশপ্রহরণধারিণী।
অভয়া শক্তি, বলপ্রদায়িনী, তুমি জাগো।
জাগো, তুমি জাগো।
প্রণমি বরদা, অজরা, অতুলা,
বহুবলধারিণী, রিপুদলবারিণী, জাগো মা।
শরন্ময়ী, চণ্ডিকা, শঙ্করী জাগো, জাগো মা।
জাগো অসুর বিনাশিনী, তুমি জাগো।
জাগো দুর্গা, জাগো দশপ্রহরণধারিণী।
অভয়া শক্তি, বলপ্রদায়িনী, তুমি জাগো।
জাগো, তুমি জাগো।

দেবী চণ্ডিকা সচেতন চিন্ময়ী, তিনি নিত্যা, তাঁর আদি নেই, তাঁর প্রাকৃত মূর্তি নেই, এই বিশ্বের প্রকাশ তাঁর মূর্তি।
নিত্যা হয়েও অসুর পীড়িত দেবতা রক্ষণে তাঁর আবির্ভাব হয়।
দেবীর শাশ্বত অভয়বাণী—
“ইত্থং যদা যদা বাধা দানবোত্থা ভবিষ্যতি ।।
তদা তদাবতীর্যাহং করিষ্যাম্যরিসংক্ষয়ম্‌ ।।”

মহালয়ার কিছু কথা..

সনাতন হিন্দু শাস্ত্রে তিনটে ঋণের কথা বলা হয়েছে- দেবঋণ, ঋষিঋণ, পিতৃঋণ। এই ঋণত্রয় পরিশোধ না করলে মৃত্যুর পরে আত্মার সদ্গতি লাভ হয় না। বিজ্ঞজনেরা বলে থাকেন, পিতৃপক্ষের উদয়কালে পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে তর্পণাদি করলে পিতৃঋণ হতে মুক্ত হওয়া যায়। আজ থেকেই সেই পিতৃপক্ষের সূচনা।
পিতৃপক্ষকে “ষোড়শ শ্রাদ্ধ” এবং “অপরাপক্ষ-ও” বলা হয়। আশ্বিনমাসের কৃষ্ণপক্ষটিই পিতৃপক্ষ নামে পরিচিত; যে অমাবস্যায় পিত্রিপক্ষের অবসান হয়, তাকে “মহালয়া অমাবস্যা” বা “সর্বপিতৃ অমানিশা” বলে। পুরাণ অনুযায়ী দেহত্যাগ হওয়ার পর আত্মা স্বর্গ ও ভূলোকের মধ্যস্থলে অবস্থিত পিতৃলোকে গিয়ে পৌঁছয়। পরবর্তী প্রজন্মের কেউ দেহত্যাগ করলে তখন পূর্ববর্তী আত্মারা পিতৃলোক ত্যাগ করে ঊর্ধ্বলোকে গমন করে। পিতৃপক্ষের আরম্ভলগ্নে সূর্য যখন তুলা রাশিতে প্রবেশ করে, তখন পিতৃলোকবাসী পূর্বপুরুষের আত্মারা গৃহে অবতরণ করেন এবং সূর্য পরবর্তী রাশিতে (বৃশ্চিক) না যাওয়া পর্যন্ত গৃহেই বাস করেন। তাই প্রত্যেক সনাতন ধর্মাবলম্বীর একান্ত কর্তব্য, সেই সময় যথাযথ নিয়মাবলী মেনে পিতৃগণের তৃপ্তি হেতু তাঁদের উদ্দেশ্যে তর্পণ করা।
মহাভারতে উল্লেখিত কর্ণ মৃত্যুর পরে যমলোকে গিয়ে ক্ষুধাতৃষ্ণায় কাতর হয়ে খাদ্য ভিক্ষা চেয়েছিলেন। যম বললেন, যেহেতু মর্ত্যে থাকাকালীন কর্ণ অজস্র ধনরত্ন দান করেছেন, কিন্তু পিতৃশ্রাদ্ধ করেননি, তাই পরলোকে তাঁর এই খাদ্যাভাব। কর্ণ বললেন, তিনি জানতেন না তাঁর পূর্বপুরুষ কে। তাই তাঁর পক্ষে তর্পণ করা সম্ভবপর হয়নি। করুণাবশত যম একপক্ষকালের (১৫ দিনের) জন্য কর্ণকে দেহ ফিরিয়ে দিলেন এবং কর্ণ মর্ত্যে এসে এই পিতৃপক্ষেই শাস্ত্রানুযায়ী পিতৃপুরুষের উদ্দেশ্যে পিণ্ডদান আদি পালন করে পুনরায় স্বর্গে ফিরে গেলেন। তাই বিদেহী পূর্বপুরুষদের আত্মার তৃপ্তি কামনা করে এই সময় জলদান অবশ্য কর্তব্য।

একটু আলাদাভাবে।

মহালয়া কী?

মহালয়া বা পিতৃপক্ষের দিন দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু। এই দিন পিতৃপক্ষের শেষ এবং দেবীপক্ষের শুরু। দক্ষিণ ও পশ্চিম ভারতে গণেশ উৎসব পরবর্তী পূর্ণিমা (ভাদ্রপূর্ণিমা) তিথিতে এই পক্ষ সূচিত হয় এবং সমাপ্ত হয় সর্বপিতৃ অমাবস্যা বা মহালয়ার অমাবস্যা তিথিতে। বাঙ্গালি সমাজে পিতৃপক্ষের শেষদিন অর্থাৎ অমাবস্যা তিথির মহালয়ার দিন পিতৃতর্পণ করার রীতি আছে। সূর্য কন্যারাশিতে প্রবেশ করলে পিতৃপক্ষ সূচিত হয়। এ সময় পিতৃপুরুষগণ সূর্য বৃশ্চিক রাশিতে প্রবেশের আগ পর্যন্ত অপেক্ষা করেন তাদের উত্তরপুরুষদের হাতে জল, পিণ্ড আদি পাওয়ার জন্য। মহাভারত অনুযায়ী, প্রসিদ্ধ দাতা কর্ণের মৃত্যু হলে তার আত্মা স্বর্গে গমন করলে স্বর্গে তাকে স্বর্ণ ও রত্ন খাদ্য হিসেবে দেওয়া হয়। কর্ণ দেবরাজ ইন্দ্রকে এর কারণ জিজ্ঞেস করলে ইন্দ্র বলেন, তিনি সারাজীবন স্বর্ণই দান করেছেন, কিন্তু পিতৃ পুরুষকে খাদ্য দেননি। তাই স্বর্গে স্বর্ণই তাকে খাদ্য হিসেবে দান করা হয়েছে। এ কারণে কর্ণকে ষােল দিনের জন্য মর্ত্যে গিয়ে পিতৃলােকের উদ্দেশ্যে অন্ন ও জল প্রদান করার অনুমতি দেওয়া হয়। এই পক্ষই পিতৃপক্ষ নামে পরিচিত। মহালয়ার দিনই পিতৃপক্ষের শেষ দিন। তাই এদিন খুব ভােরে পুরুষেরা গঙ্গা বা কোনাে নদীর তীরে গিয়ে জলে নেমে কোশাকুশি, তিল, জল আদি বস্তু নিয়ে ব্রাহ্মণের সহায়তায় পিতৃপুরুষকে তর্পণ করেন। বাৎসরিক শ্রাদ্ধ অনুষ্ঠানে যারা অপারগ, তারা এই সর্বপিতৃ অমাবস্যা বা মহালয়ায় তর্পণ, শ্রাদ্ধ, দান আদি করতে পারেন পিতৃপুরুষের আত্মার উন্নতির জন্য। কর্মকাণ্ডীয়দের জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই দিন গয়ায় শ্রাদ্ধ করলে বিশেষ ফল লাভ হয়। উল্লেখ্য, শ্রীবিষ্ণুর পাদপদ্ম-চিহ্নধন্য গয়াধামে সমগ্র পিতৃপক্ষ জুড়ে মেলা চলে। এই দিন অতি প্রত্যুষে চণ্ডীপাঠ করার রীতি আছে ।

শেয়ার করুন