মা কালীর মাহাত্ম্য :

রামকৃষ্ণ চ্যাটার্জী : কোলকাতা::: ও জয় মা কালী ॐ
চলুন আমরা মা কালী আরো কিছু তত্ত্ব জেনে আসি । মা কালীকে দুর্গার ললাট থেকে উৎপন্না বলা হয়েছে। যথা—”দুর্গার ললাটে জাতা জলদবরণী।” কালী দুর্গার ললাট থেকে উৎপন্না হয়েছেন—এই বাক্যের তাৎপর্য যে, ললাটের সংকোচনেই ক্রোধভাব প্রকাশিত হয় বলে সদা ক্রোধান্বিতা; রণরঙ্গিনী করাল-বদনা কালীকে ললাট-সম্ভবা বলা হয়েছে। বাস্তবিক কালীও দুর্গার রূপান্তর বিশেষ। ক্রোধাবস্থাপন্না শক্তিকেই কালী বলা বয়েছে। ভয়ানক ভাবান্বিতা বিশ্বব্যাপিনী শক্তি—এই অর্থে ঈশ্বরের নাম কালী। এই জন্য কালীর বিবিধ প্রকার ভয়ানক মূর্তি কল্পিত হয়েছে। ধূমাবতী, ছিন্নমস্তা ও ভৈরবী—এ সবারই অতি ভয়ংকর মূর্তি। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে একটি ধ্যান দেওয়া হল। দক্ষিণাকালীর ধ্যান—
করালবদনাং ঘোরাং মুক্তকেশীং চতুর্ভূজাম্। কালিকাং দক্ষিণাং দিব্যাং মুণ্ডমালাবিভূষিতাম্।। সদ্যশ্চিন্নশিরঃখড়্গবামাধোর্ধ্বকরাম্বুজাম্। অভয়ং বরদং চৈব দক্ষিণোর্ধ্বাধঃপাণিকাম্।। মহামেঘপ্রভাং শ্যামাং তথা চৈব দিগম্বরীম্। কর্ণাবসক্তমুণ্ডালীগলদ্রুধিরচর্চিতাম্।। কর্ণাবতংসতানীতশবযুগ্মভয়ানকম্। ঘোরদ্রংষ্টাং করালাস্যাং পীনোন্নতপয়োধরাম্।। শবানাং করসংঘাতৈঃ কৃতকাঞ্চীং হসন্মুখীম্। সৃক্কদ্বয়গলদ্রক্তধারাবিস্ফুরিতাননাম্।। ঘোররাবাং মহারৌদ্রীং শ্মশানালয়বাসিনীম্। বালার্কমণ্ডলাকারলোচনত্রিতয়ান্বিতাম্।। দন্তুরাং দক্ষিণব্যাপিমুক্তালম্বিকচোচ্চয়াম্। শবরূপমহাদেবহৃদয়োপরি সংস্থিতাম্। শিবাভির্ঘোররাবাভিশ্চতুর্দিক্ষু সমান্বিতাম্। মহাকালেন চ সমং বিপরীতরতাতুরাম্।। সুখপ্রসন্নবদনং স্মেরাননসরোরুহম্। ছিন্নমস্তার ধ্যান আরও ভয়ংকর। বাস্তবিক কালীর মূর্তি, অস্ত্র, অনুচরী ডাকিনী ও যোগিনী এবং বাসস্থান ভূতশ্মশান সবই ভয়ানক ভাবের অবতার বিশেষ। কালী-সংক্রান্ত সব কিছুই যেমন ভয়ানক, তেমন আবার কৃষ্ণ সংক্রান্ত সব কিছুই আনন্দপ্রদ। কৃষ্ণের মূর্তি মনোহর। হাতে আনন্দজনক শব্দকর মুরলী। প্রিয়তমা আনন্দরূপিণী রাধিকা। মনোহর বেশধারিণী সখীগণের মধ্যে কেউ বীণা, কেউ বংশী, কেউ রবাব, কেউ মৃদঙ্গ, কেউ বা খঞ্জনী বাজাচ্ছেন। সংক্ষেপে বললে, তাঁরা নৃত্যগীতে মেতে থাকেন, নানা রকম বাদ্যযন্ত্র সুন্দর বাজাতে পারেন এবং সাদা, লাল, নীল, হলুদ প্রভৃতি নানা রঙের সুন্দর বস্ত্র পরে থাকেন। কালীর মূর্তি ও সংগ্রামকর্ম—দুইই ভয়ংকর। কৃষ্ণের মূর্তি ও নৃত্যগীতরূপ কাজ উভয়ই মনোহর। কালীর উপাসকেরা যেমন সব রকম ভয়ানক ভাবের একত্র সমাবেশ করতে যার-পর-নাই যত্নপরায়ন হয়েছেন, তেমন কৃষ্ণের উপাসকগণও আনন্দজনক ভাব সংগ্রহে, যিনি যেখান থেকে পেরেছেন, সেখান থেকে উপকরণ সঞ্চয় করে গেছেন। কালীর বাসস্থান ভয়ানক শ্মশান, কৃষ্ণের বাসস্থান মনোহর বৃন্দবন। কালীর হাতে ভয়ানক খড়্গ, কৃষ্ণের হাতে মনোহর বাঁশি। কালীর শরীর রক্তমাখা, কৃষ্ণের শরীর চন্দনমাখানো। কালী গম্ভীর গর্জন করেন, কৃষ্ণ মিষ্টি মিষ্টি কথা বলেন। কালী যুদ্ধে মেতে থাকেন, কৃষ্ণ নাচগান করেন। কালীর গলায় মুণ্ডমালা, কৃষ্ণের গলায় ফুলের হার। সংক্ষেপে বললে, কালীর ভয়ানক বেশ, কৃষ্ণের মূর্তি মনোহর। কালীর উপাসকরা নানারকম প্রাণী বলি দেয়, কৃষ্ণের উপাসনায় বলি নিষিদ্ধ। কালীপূজার কাল অমাবস্যা তিথি ও ঘনঘোর অন্ধকার রাত। মৃতদেহের উপর বসে, শ্মশানে তাঁর সাধনা করতে হয়। পূজার বাদ্যযন্ত্র ঢাক ও উপহারের ফুল টকটকে লাল রঙের জবা। তান্ত্রিকেরা আবার পঞ্চ-মকার দিয়ে ভয়ানক সাধনপ্রণালীর বিধানও দিয়েছেন। মদ্য, মাংস, মৎস্য, মুদ্রা ও মৈথুন—এই পঞ্চ-মকারের প্রায় প্রত্যেকই বাইরে থেকে দেখলে এক এক ভয়ানক সাধন-প্রণালী। বাইরে থেকে—এই কথা বলার তাৎপর্য এই যে, ওই পঞ্চ-মকারের আধ্যাত্মিক ভাব অত্যন্ত নির্মল ও উচ্চ। লোকনাথ বসু তাঁর হিন্দুধর্ম মর্ম নামক বইয়ে পঞ্চ-মকার সম্পর্কে আগমসারের যে এক অংশ উদ্ধৃত করেছেন, তার তাৎপর্য এই যে, ঐ স্থানে মদ্য বলতে পানীয় মদ বোঝায় না, তা ব্রহ্মরন্ধ্র থেকে ক্ষরিত অমৃতধারা বা ব্রহ্মানন্দ; মাংস মানে দেহের মাংস নয়, তা হল জিভের সংযম; মৎস্য বলতে মাছ বোঝায় না, তা হল শ্বাসনিরোধ (প্রাণায়ম); মুদ্রা মানে টাকাপয়সা নয়, বরং আত্মাতে যে পরমাত্মা মুদ্রিত হয়ে আছেন, সেই তত্ত্বজ্ঞান এবং মৈথুন বলতে যৌনসংগম বোঝায় না, তা হল জীবাত্মাতে পরমাত্মার বিরাজ।

শেয়ার করুন