লাক্ষা চাষ পাল্টে দিতে পারে পুরুলিয়ার অর্থনৈতিক চিত্র


নিশীথ ভূষণ মাহাত,পুরুলিয়া : পুরুলিয়া নামের উৎপত্তির সঙ্গে ‘লাক্ষা’ শব্দটি জড়িত । অনেক গবেষকের মতে ‘পুরু'(মোটা) এবং ‘লাক্ষা'( পুরু + লাক্ষা = পুরুল্যা) এই শব্দ দ্বয়ের থেকেই পুরুল্যা বা পুরুলিয়া নামটির সৃষ্টি হয়েছে । একসময়ে লাক্ষা চাষে বিশেষ সুনাম ছিল এই জেলার । বাগমুন্ডি,বলরামপুর, জয়পুর, ঝালদা সহ জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মানুষের জীবন জীবিকা ছিল লাক্ষা চাষ এবং লাক্ষার সঙ্গে জড়িত শিল্প । প্রসঙ্গত লাক্ষা হল একধরনের ক্ষুদ্র কীট । এরা গাছের ডালে বাসা বাঁধে এবং গাছের নির্যাস খেয়ে বেঁচে থাকে । স্ত্রী কীটের দেহ থেকে এক ধরনের রেজিন বের হয় । এই আঠালো পদার্থটি গলিয়ে তৈরি হয় গালা । এই গালা বৈদ্যুতিক শিল্প, গয়না শিল্প, খেলনা ও শৌখিন দ্রব্যাদি তৈরীতে কাজে লাগে । পুরুলিয়ায় উৎকৃষ্ট মানের লাক্ষা উৎপাদিত হয় । সবচেয়ে উৎকৃষ্ট লাক্ষা ভালো পরিমানে উৎপাদিত হয় কুসুম গাছে । তাই পুরুলিয়ায় একসময় একটা গান প্রচলিত ছিল । গানটি ছিল ‘পণ দিতে হবেক নাই গো , দিও কতেক কুসুম গাছের চারা “। বোঝাই যাচ্ছে কুসুম গাছে লাক্ষা চাষ ভালো হয় বলেই এটি চাওয়া হত বর পক্ষ থেকে । তবে কুসুম ছাড়াও লাক্ষার চাষ ভালো হয় কুল এবং পলাশ গাছেও । বর্তমানে লাক্ষার চাহিদা রয়েছে দেশে এবং বিশ্বের বাজারেও সমান ভাবে । তথাপি দেখা যাচ্ছে সাম্প্রতিক কালে জেলার সাধারণ চাষীদের মধ্যে সম্ভাবনাময় এই অর্থকরী ফসলটির প্রতি ঝোঁক কমতে কমতে একেবারেই তলানিতে ঠেকেছে । জাহাজপুর কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রের প্রধান তথা সিনিয়র কৃষি বিজ্ঞানী ডঃ মানস কুমার ভট্টাচার্য বলেন ” লাক্ষা এমন একটা অর্থকরী ফসল যার অনুকূল ভৌগোলিক পরিবেশ রয়েছে এই জেলায় । এখানে অতি উৎকৃষ্ট মানের লাক্ষা চাষ করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করা সম্ভব । এবিষয়ে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ,পরামর্শ সহ বীজ এবং কীটনাশক প্রভৃতি সুবিধা দেওয়া হয়ে থাকে । এবছর থেকে ‘আই সি এ আর’ থেকে এক প্রকল্প চালু হয়েছে যেখানে প্রতি বছর দশ জন যুবককে লাক্ষা চাষে উৎসাহিত করা হবে । তাদেরকে প্রশিক্ষণ এবং অন্যান্য সব রকম সাহায্য দেওয়া হবে । আমার মতে জেলার ছেলেরা লাক্ষা চাষে মনোযোগী হলে কাজের খোঁজে ভিন রাজ্যে যেতে হবে না । এখানেই ভালো অর্থ উপার্জন করে স্বনির্ভর হতে পারবেন । এবিষয়ে জেলার এক সেরা লাক্ষা চাষী জয়দেব মাহাত র মত পুরুলিয়া জেলার মানুষের অর্থনৈতিক চিত্র পাল্টে দিতে পারে এই লাক্ষা । একবিঘা জমিতে প্রতি মাসে লক্ষাধিক টাকা উপার্জন করা সম্ভব । বর্তমানে লাক্ষার কেজি প্রতি দাম চারশ টাকা , এক বিঘা জমিতে প্রায় তিরিশ কুইন্টাল পর্যন্ত লাক্ষা উৎপাদন করা সম্ভব ছয় মাসে । যার দাম প্রায় পাঁচ লক্ষ টাকা । উল্লেখ্য জয়দেব বাবু দীর্ঘদিন ধরে এই চাষের সঙ্গে যুক্ত । এই চাষের মাধ্যমেই তিনি আজ কয়েক লক্ষ টাকার মালিক । তিনি লাক্ষা সাপ্লাই করছেন তামিলনাড়ু, কেরালা, ওড়িশা, হরিয়ানা সহ ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে এমনকি প্রতিবেশী দেশ নেপাল, ভুটান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কাতেও রপ্তানি করা হয় জয়দেব বাবুর লাক্ষা । এছাড়াও লাক্ষার স্যাম্পল পাঠানো হয়েছে ব্রাজিল, জাপান, জার্মানি, ফিলিপিন্স প্রভৃতি দেশে। শুধু তাই নয় জয়দেব বাবু লাক্ষা চাষে পুরুলিয়া জেলাকে গর্বিত করেছেন । জাতীয় স্তরে বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন তিনি । দিল্লিতে লাভ করেছেন ‘পুষা এওয়ার্ড, ব্যাঙ্গালোরে ‘আই সি এ আর’ এর ‘সুপার ফার্মার’ পুরষ্কার ।
জয়দেব বাবুর মতে লাক্ষা পুরুলিয়ার আর্থিক চিত্র পাল্টে দিতে পারে । যদি জেলার যুবকরা এই চাষ ঠিক ভাবে করতে পারেন । যুবকদের স্বনির্ভর হতে হলে এই চাষের উপর গুরুত্ব দিতে হবে ।

শেয়ার করুন