দেশে ফের বাড়ল করোনা সংক্রমণের হার, গুজরাট ও মধ্যপ্রদেশে শুরু হল নাইট কার্ফু

নিজস্ব প্রতিবেদন: ২০২০-এর শুরু থেকে করোনা ভাইরাস জেঁকে বসেছে দেশে। করোনার জেরে মৃত্যু হয়েছে ১ লাখের বেশি মানুষের। করোনা রুখতে দেশে লকডাউন জারি করে সরকার। লকডাউন ও নানান বিধি-নিষেধ মেনে চলার পর বেশ কিছুটা নযন্ত্রনে আসে করোনা সংক্রমণের হার। অক্টবরে করোনা পরিস্থিতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণের আসার সাথে সাথে দেশবাসী ফের সরকারের নির্দেশ অমান্য করতে শুরু করে। মাস্ক ব্যবহার না করে বাইরে বেরোনো, অনুষ্ঠান, পার্টি ইত্যাদিতে সোশ্যাল ডিস্টেন্স না মেনেই ভিড় করা শুরু হয়ে যায়। আর তাতে ফের করোনা পরিস্থিতি বিপরীত দিকে এগোলো। বেশ কিছুদিন সংক্রমণের হার অনেকটা কমতে দেখা যায়। সুস্থের হার বাড়তে থাকে। বর্তমানে ফের করোনা আক্রান্তের হার বেড়ে গিয়েছে।

গুজরাট ও মধ্যপ্রদেশের বেশ কিছু শহরে নাইট কার্ফু চালু হয়েছে। হিমাচলপ্রদেশের থোরাংয়ে একজন বাদে গোটা গ্রামের সকলে করোনা পজেটিভ। করোনা সংক্রমণ ঠেকাতে ফের লাহুল স্পিতিতে অনির্দিষ্টকালের জন্য পর্যটকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। পাশাপাশি দিল্লি সরকার জানিয়েছে, দিল্লিতে মাস্ক না পরলেই ২ হাজার টাকা জরিমানা।ফের করোনা সংক্রমণের হার বৃদ্ধি পাচ্ছে।

করোনার থাবায় বিশ্বজুড়ে ত্রাহি ত্রাহি রব। দেশবাসী এখন করোনা ভ্যাকসিনের আশায় পথ চেয়ে বসে আছে। বিশ্বের তাবড় তাবড় বিজ্ঞানীরা ভ্যাকসিন তৈরির চেষ্টা চালাচ্ছে। তার মধ্যেই প্রথম ঝড় সামলে ওঠার আগেই ইউরোপ, আমেরিকায় শুরু হয়েছে কোভিড নাইন্টিনের সেকেন্ড ওয়েভ। ভারতেও মোট করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ৯০ লক্ষ পেরিয়ে গিয়েছে। মৃতের সংখ্যাও পেরিয়েছে ১ লক্ষ ৩২ হাজার! লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে সংক্রমণ। ঊর্ধ্বমুখী অ্যাক্টিভ কেসের সংখ্যা।

করোনা সংক্রমণের হার বাড়তে থাকায় গুজরাত, মধ্যপ্রদেশে আবারও ফিরে এল কার্ফু। শুক্রবার রাত ৯টা থেকে সোমবার সকাল ৬টা পর্যন্ত সম্পূর্ণ কার্ফু জারি করা হয়েছে আমদাবাদে। রাজকোট, সুরাট, ভদোদরায় শনিবার থেকে শুরু হচ্ছে নাইট কার্ফু। অর্থাৎ‍ রাত ৯টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত।সংক্রমণ বৃদ্ধির আশঙ্কায় মধ্যপ্রদেশ সরকারও এই একই পদক্ষেপ করছে। সে রাজ্যের বেশ কয়েকটি জায়গায় শনিবার থেকে নাইট কার্ফু শুরু হচ্ছে।

ভোপাল, গ্বয়ালিয়র, বিদিশা এবং রতলাম জেলায় প্রতিদিন রাত ১০টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত নাইট কার্ফু হবে। পাশাপাশি বিভিন্ন রাজ্য সরকার স্কুল, কলেজ খোলার পরিকল্পনা করতে শুরু করেছে। এদিকে হরিয়ানায় স্কুল খোলার পর এখনও পর্যন্ত ১৭২ জন পড়ুয়া এবং প্রায় তত সংখ্যক শিক্ষক-শিক্ষিকা সংক্রমিত হয়েছেন। এই পরিস্থিতিতে আগামী ১৫ দিনের জন্য সে রাজ্যে সমস্ত স্কুল বন্ধের নির্দেশ দিয়েছেন হরিয়ানার শিক্ষামন্ত্রী কানওয়ার পাল।হিমাচলের লাহুল লাহুল-স্পিতিতে শুধুমাত্র একজনই এখনও পর্যন্ত রোগের হাত থেকে রেহাই পেয়েছেন।

এই পরিস্থিতিতে সেখানে অনির্দিষ্টকালের জন্য পর্যটকদের প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে।অন্যদিকে দেশে কোভ্যাক্সিনের ট্রায়াল সশুরু হয়েছে। চলছে কোভ্যাক্সিনের তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়াল। আম্বালা হাসপাতালে তৃতীয় পর্যায়ের ট্রায়ালে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে যোগ দিয়ে কোভ্যাক্সিনের ডোজ নিলেন হরিয়ানার স্বাস্থ্যমন্ত্রী অনিল ভিজ। রাজস্থানের স্বরাষ্ট্র দফতরও সেখানকার জেলা প্রশাসনকে ১৪৪ ধারা অনুযায়ী বেশকিছু বিধিনিষেধ জারির নির্দেশ দিয়েছে।সংক্রমণ রুখতে দিল্লির লেফটেন্যান্ট জেনারেল মহামারী আইনে সংশোধনী এনেছেন।

দিল্লিতে মাস্ক না পরলে ২ হাজার টাকা জরিমানা করা হবে। পাশাপাশি কোয়ারেন্টিন বিধি ভাঙলে, কিংবা সামাজিক দূরত্ব না মানলেও ২ হাজার টাকা করে জরিমানা করা হবে। পুণের ভ্যাকসিন নির্মাতা সংস্থা সিরাম ইনস্টিটিউট অফ ইন্ডিয়ার সিইও আদর পুনাওয়ালা জানিয়েছেন, অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তৈরি ভ্যাকসিন কোভিশিল্ড সম্ভবত ফেব্রুয়ারির মধ্যেই ভারতের বাজারে চলে আসবে। প্রধানমন্ত্রী এ নিয়ে ইতিমধ্যে ভাবতে শুরু করেছেন, যে কীভাবে হবে ভ্যাকসিনের বণ্টন? দেশের সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে এই ভ্যাকসিন। দিল্লি এবং হায়দরাবাদ বিমানবন্দরকে ইতিমধ্যে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, দেশের সকল প্রান্তে দ্রুত করোনার ভ্যাকসিন পৌঁছে দেওয়ার জন্য। শুক্রবার করোনার টিকা সংক্রান্ত একটি উচ্চ পর্যায়ের বৈঠক করলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। প্রধানমন্ত্রী ট্যুইট করে জানান, ভ্যাকসিন উৎপাদনের পর্যালোচনা করার পাশাপাশি তা বণ্টনের ব্যাপারেও ভবিষ্যতের রোডম্যাপ তৈরি করে রাখা হয়েছে।

ট্যুইটারে মোদি লেখেন, “প্রতিষেধক নিয়ে ভারতের কৌশল ও ভবিষ্যতের কর্মপন্থা নির্ধারণ করতে একটা বৈঠকে বসেছিলাম। ভ্যাকসিন তৈরি, তার অনুমোদন এবং তা সংগ্রহ করা নিয়ে বিশদে আলোচনা হয়েছে। জনসংখ্যার নিরিখে প্রাধান্য কাদের পাওয়া উচিত তা নিয়ে, এইসিডব্লিউ-দের সঙ্গে কথা বলেছি, কারা টিকা দেবেন, কী কী প্রযুক্তি লাগবে, সব কিছু নিয়েই কতা হয়েছে।” হরিয়ানায় শুক্রবার কোভ্যাক্সিনের তৃতীয় দফার ট্রায়াল শুরু হল।হরিয়ানার রাজ্যের ৬৭ বছর বয়সি মন্ত্রী অনিল ভিজ আগে ত্যিত করে জানান, তিনিই হরিয়ানার প্রথম স্বেচ্ছাসেবক, যিনি এই ভ্যাকসিনের ডোজ নেবেন। তাঁর শরীরে কোভ্যাক্সিনের একটি পরীক্ষামূলক ডোজ প্রয়োগ করা হয়। এদিন অম্বালার একটি হাসপাতালে ডোজ নেন তিনি।

নভেম্বরে পুজোর পরেও দেশে সংক্রমণ কমার একটা প্রবণতা দেখা যাচ্ছিল। আক্রান্তের সংখ্যা কমবেশি হতে থাকলেও তা নিচের দিকে নামছিল।সংক্রমণ ও মৃত্যুর সংখ্যা ওঠা নাম করছিল।অক্টোবরে দেশে করোনা সংক্রমণ ছিল নিম্নমুখী, যা অবশ্যই আশার আলো দেখিয়েছে। নভেম্বরেও সেই সংখ্যাটা মোটামোটি বজায় ছিল মাঝামাঝি পর্যন্ত। কিন্তু গত ৪ দিনে ফের তা বাড়তে থেকেছে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা। ক্রমশ উর্ধ্বমুখী হচ্ছে হারটা। গত ২৪ ঘন্টায় দেশে নতুন করে সংক্রমিতের সংখ্যাটা দাঁড়িয়েছে ৪৬ হাজার ২৩২ জন। একদিনে পরীক্ষা হয়েছে দেশে ১০ লক্ষ ৬৬ হাজার ২২টি নমুনা।

২৪ ঘন্টায় রোগীর সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৯০ লক্ষ ৫০ হাজার ৫৯৭। গত শুক্রবারের ছন্দপতনের পর এদিন অবশ্য সুস্থ হয়ে ওঠা মানুষের সংখ্যা সংক্রমিতের চেয়ে বেশিই হয়েছে।অক্টোবরে দেশে দৈনিক মৃতের সংখ্যা ৩ অঙ্কের ঘরেই অধিকাংশ সময় থেকেছে। অক্টোবরের শেষে ৫০০-র ঘরেই ছিল দৈনিক মৃত্যু। নভেম্বরের এই সংখ্যাটা কখনও ৪০০ তো কখনও ৫০০-র ঘরেই অধিকাংশ সময় ঘোরাফেরা করেছে।পাশাপাশি জানা যাচ্ছে, করোনাভাইরাসের এই তৃতীয় তরঙ্গ আমেরিকার অর্থনীতিতেও কালো ছায়া ফেলেছে।

সংক্রমণের হার সেখানে বেশ বেড়েছে। এরূপ করোনা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়লে ফের চিন্তা বাড়ছে আমেরিকাবাসীদের। এই পরিস্থিতি আঘাত হানতে পারে আমেরিকার অর্থনীতিতে। এদিকে ‘গ্রেট ডিপ্রেশনে’র পরে আমেরিকার অর্থনীতির উপর যথেষ্ট চাপ পড়েছে। করোনা পরিস্থিতি কিছুটা কাটিয়ে সেই চাপ সামলেই একটু একটু করে ঘুরে দাঁড়াতে চেষ্টা করছিল আমেরিকা। কিন্তু, ফের করোনার জোয়ার এল আমেরিকায়। অর্থনীতিবিদদের একাংশের ধারণা, করোনার ফলে যে ক্ষতি হচ্ছে, তা কাটিয়ে উঠতে সে দেশের দীর্ঘ সময় লেগে যাবে।

শেয়ার করুন