উত্তমকুমার বাংলা সিনেমার চে, আর সৌমিত্রবাবু ফিদেল’ : পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়

কলকাতা: করোনা আক্রান্ত সৌমিত্রবাবু টানা ৪০ দিন হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে শেষমেশ জীবনযুদ্ধে হার মানলেন। আজ সকাল ১২ টার সময় তাঁর মৃত্যুর খবর প্রকাশ হয়। হাজার হাজার মানুষ তাঁর সুস্থতার কামনা করছিলেন। আজ তাঁর মৃত্যুর খবরে গোটা বাংলা শোকস্তব্ধ। বাংলা চলচিত্রে তাঁর অবদান অতুলনীয়। মৃত্যুর শেষ বয়স পর্যন্ত তিনি একের পর এক সিনেমার চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন। তাঁর অভিনয় সিনেমা দেখতে বাধ্য করত সিনেমাপ্রেমীদের। সত্যজিৎ রায়ের ‘অপুর সংসার’ দিয়ে শুরু তাঁর এই সিনেমা জগৎ। তিনি ৩০০ টিরও বেশি সিনেমায় অভিনয় করেছেন। সত্যজিৎ রায়ের প্রিয় নায়ক তিনি ছিলেন। সৌমিত্রবাবুর প্রয়ানে চলচিত্র জগতের প্রায় সকলে শোকপ্রকাশ করেছেন। হাসপাতালের সামনে দাঁড়িয়ে মুখ্যমন্ত্রী তাঁর চলে যাওয়াকে এক ইতিহাস শেষ হল বলে ব্যাখ্যা করেন। শোকপ্রকাশ করেছেন প্রখ্যাত শিল্পী, অভিনেতা, অভিনেত্রী, পরিচালক, নাট্যকার সহ নানান জনপ্রিয় ব্যক্তিগণ।

নিপুণ অভিনয় দিয়ে অপু-অপর্ণার অমরগাথা তৈরি করেছিলেন সৌমিত্র-শর্মিলা জুটি। এরসাথে ক্যামেরার পিছনেও দুজনের গভীর বন্ধুত্ব ছিল। সেই রসায়নই পরবর্তীকালে ‘দেবী’, ‘অরণ্যের দিনরাত্রি’, ‘বর্ণালী’র মতো সব কালজয়ী ছবির ভীত তৈরি করে। অন্যদিকে, শুটিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে সৌমিত্রর সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার সুযোগ খুঁজতেন অপর্ণা, এমনটাই জানালেন অপর্ণা সেন। জীবনে তিনি তাঁর থেকে অনেককিছু শিখেছিলেন। দুই চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্বের এই পারস্পরিক সম্মানের সম্পর্কের জেরে দর্শকরা উপহার পেয়েছেন ‘আকাশ কুসুম’, ‘বাক্স বদল’, ‘নিশিমৃগয়া’, ‘বসন্ত বিলাপ’, ‘পারমিতার একদিন’, ‘বসু পরিবার’। সত্যজিৎ রায়ের ‘ঘরে বাইরে’ আজও ক্লাসিক। এছাড়া স্বাতীলেখা সেনগুপ্ত এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের রসায়ন যেন আরও বেশি জমেছিল। এই জুটির সর্বশেষ কাজ নয়া প্রজন্মের কাল্ট-ফেভারিট ‘বেলাশেষে’তে। যে ছবি এখনও দর্শকদের কাছে ‘হিট’। আবার অন্যদিকে, ‘হয়তো তোমারই জন্য, হয়েছি প্রেমে যে বন্য’, এভাবেই বাঙালির শাশ্বত প্রেমের কাব্য রচনা করেছিলেন সৌমিত্র-তনুজা জুটি। ‘প্রথম কদম ফুল’-এর গন্ধের মতো আজও এই গান নতুন প্রজন্মের আবেগের স্রোতকে দিশা ঠিক করে দেয়। খুঁজে দেয়।

তাঁর মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়। প্রায় দিন সন্ধ্যেবেলায় সৌমিত্রবাবুর সঙ্গে আড্ডায় বসতেন তিনি। সিনেমা, রাজনীতি, নাটক, সাহিত্য- কত কিছু নিয়ে আলোচনা। কিন্তু আর দিনগুলো ফায়ার আসবে না। পরমব্রতের মতে উত্তমকুমার বাংলা সিনেমার চে গেভারা আর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় হচ্ছেন ফিদেল কাস্ত্রো। তাঁর মতে উত্তমকুমার যখন তাঁর খ্যাতি ও সাফল্যের চূড়ায়, তখন মারা গিয়েছিলেন। ফলে তাঁর সেই নায়ক ইমেজটা থেকে গিয়েছে। তাঁকে আর অন্য কিছুর মুখোমুখি হতে হয়নি। বাংলা ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির এই দশা, সিরিয়াল—দেখতে হয়নি কোনও কিছুই। ঠিক যেমন রাজনীতিতে চে। আর ফিদেল? তাঁকে কত কিছু দেখতে হয়েছে। রাজনীতির পঙ্কিল অধ্যায় তো তাঁকেই কাটাতে হয়েছে। ঠিক সৌমিত্রবাবুর মতো। তাই উত্তমকুমার বাংলা সিনেমার চে, আর সৌমিত্রবাবু ফিদেল।

পরমব্রত জানান, সৌমিত্রজেঠুর বায়োপিক ‘অভিযান’ করার সুবাদে সম্প্রতি তাঁদের সবচেয়ে বেশি ঘনিষ্ঠে আসা। শ্যুটিং শুরু হয়েছিল ফেব্রুয়ারির শেষে। গত বছরের সেপ্টেম্বর-অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছিল তাঁদের আড্ডা। সৌমিত্রবাবুর সঙ্গে কাটানো সন্ধ্যেগুলো পরমব্রতর কাছে সেরা হয়ে উঠেছিল। পরমব্রত বলেন, “সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে শুধু একজন অভিনেতা, একজন কবি, একজন নাট্যকার, একজন গদ্যকার হিসেবে দেখলে চলবে না। উনি শুধুই সেটা ছিলেন না। উনি সার্বিক ভাবে ছিলেন একজন শিল্পমনস্ক মানুষ। শিল্পের যে সঙ্কটগুলো পৃথিবীতে রয়েছে, শিল্পের যে দোলাচল মানুষকে ভাবায়, সেটাই একজনকে শিল্পী করে তোলে, আর সৌমিত্রজেঠুকেও তাই করে তুলেছিল। উনি একদিকে অভিনয় করতেন, নাটক লিখতেন, কবিতা লিখতেন, আবার পাঠ করতেন, গদ্য লিখতেন, বামপন্থাতেও তাঁর ঝোঁক ছিল, কোনও নির্দিষ্ট সরলরেখায় তাঁকে বাঁধা সম্ভব নয়”।

শেয়ার করুন